গণঅভ্যুত্থানে সরকার বদলের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা যাচাই কার্যক্রম শুরু হলে এ খাতের দুরবস্থার চিত্র ক্রমে প্রকাশ পায়। আগে বেশির ভাগ ব্যাংক খেলাপি ঋণ লুকিয়ে তার বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন করত না। এতে নিট মুনাফা অনেকটা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হতো। এক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপের পর যতটা পারছে প্রভিশন করছে ব্যাংক। এতে সিংহভাগ ব্যাংকের নিট মুনাফায় বিশাল পতন হয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৪ ব্যাংকের প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনায় এমন চিত্র মিলেছে।
প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছরের প্রথম অর্ধে মুনাফায় থাকা সাত ব্যাংক এ বছর বিশাল অঙ্কের লোকসান করেছে। আবার মুনাফায় থাকা ২৫ ব্যাংকের মোট মুনাফা ৪০ কোটি টাকা কমে চার হাজার ৬৯৫ কোটি টাকায় নেমেছে। আবার মুনাফায় থাকা ২৫ ব্যাংকের মধ্যে ১৪টির চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের নিট মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে।
ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৩৪ ব্যাংকের মধ্যে ৯টি চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট আট হাজার ২৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। গত বছরের একই সময়ে এই ৯ ব্যাংকের মধ্যে সাতটি ৫৩০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল বলে তথ্য প্রকাশ করেছিল। ব্যাংকগুলো হলো– প্রিমিয়ার, এসআইবিএল, আইএফআইসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী এবং এবি ব্যাংক।
ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত শেয়ারপ্রতি আয়ের (ইপিএস) সঙ্গে মোট শেয়ার গুণ করে তাদের নিট মুনাফা বা লোকসানের হালনাগাদ চিত্রটি পাওয়া গেছে। এ হিসাবে এ বছরের প্রথম অর্ধে লোকসানে থাকা বাকি দুটির মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসান গত বছরের তুলনায় ৩৪৫ কোটি টাকা বেড়ে ৯৮৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আর আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের গত বছরের মতো এ বছরও ৪২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
গত বছরের বার্ষিক হিসাব চূড়ান্ত না হওয়ায় ইউনিয়ন ব্যাংক এখনও এ বছরের প্রথম ছয় মাসের লাভ-লোকসানের তথ্য প্রকাশ করেনি। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংক সম্প্রতি বার্ষিক হিসাব প্রকাশ করলেও এখনও অর্ধবার্ষিক হিসাব চূড়ান্ত করে প্রকাশ করার জন্য পর্ষদ সভা করেনি।
এদিকে পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত বছরের মুনাফায় থাকা ২৫ ব্যাংক চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন সময়কালে সাকল্যে নিট চার হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। গত বছরের একই সময়ে এই ব্যাংকগুলো নিট চার হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল বলে তথ্য দিয়েছিল।
অন্য এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই ২৫ ব্যাংকের মধ্যে ১১টির কম-বেশি মুনাফা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। এগুলো হলো– ব্র্যাক, পূবালী, প্রাইম, দি সিটি, এনসিসি, ইস্টার্ন, সাউথইস্ট, ব্যাংক এশিয়া, স্ট্যান্ডার্ড, যমুনা এবং এমটিবি।
এর মধ্যে সর্বাধিক ব্র্যাক ব্যাংকের নিট মুনাফা বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৮৭ কোটি টাকা বেড়ে ৭০৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। টাকার অঙ্কে মুনাফা বৃদ্ধিতে এর পরের অবস্থানে থাকা পূবালী ব্যাংক ৫৭৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে বলে জানিয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৪৬ কোটি টাকা বেশি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা প্রাইম ব্যাংকের নিট মুনাফা ৯৯ কোটি টাকা বেড়ে ৪১০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। গত বছরের মতো এ বছরের প্রথম ছয় মাসে মুনাফায় থাকা ১৪ ব্যাংকের নিট মুনাফা ৬২৩ কোটি টাকা কমে ১ হাজার ২৮৯ কোটি টাকায় নেমেছে। এসব ব্যাংকের নিট মুনাফা কমার হার ৩২ দশমিক ৬০ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা খুঁজে বের করে তার বিপরীতে প্রভিশন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাধ্য করার পর ব্যাংকগুলোর মুনাফা নেতিবাচক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ব্যবসা ক্ষেত্রে বিনিয়োগের কিছুটা স্থবিরতা থাকায় ঋণ চাহিদা কম ছিল। ফলে এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ছিল কম।
জানতে চাইলে প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বাস্তবতার কারণে ব্যাংকগুলোর গত বছরের মুনাফার সঙ্গে এ বছরের মুনাফা তুলনা করছি। আদতে অধিকাংশ ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ তুলনা অর্থহীন। কারণ ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ লুকিয়ে প্রভিশন করত না। ব্যাংকগুলো মুনাফা বাড়িয়ে দেখাত। বহু ব্যাংকের আর্থিক হিসাব অন্য ব্যাংক বিশ্বাসই করত। এ বছর সে তুলনায় উন্নতি হয়েছে।’ মনিরুজ্জামান বলেন, কিছু কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০ থেকে প্রায় শতভাগ। এর বিপরীতে প্রভিশন করা বাস্তবে সম্ভব নয়। ফলে প্রকৃত অবস্থা বের হতে আরও সময় লাগবে।