প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’: তারেক রহমান
বক্তব্য রাখছেন তারেক রহমান
দীর্ঘ ১৭ বছর পরে দেশে ফিরে ‘প্রত্যাশিত বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে। যদি সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয়, এই দেশের প্রতিটি মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে।
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মঞ্চে উঠে ‘প্রিয় বাংলাদেশ’ বলে বক্তব্য শুরু করেন তারেক রহমান। দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সালাম দিয়ে দেশে ফিরে আসতে পারায় সৃষ্টিকর্তার দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ৭৫-এর ৭ নভেম্বর আবার সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ৯০-এর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এদেশের জনগণ, খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ছিনিয়ে এনেছিল। কিন্তু তারপরও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি।
‘আমরা তার পর দেখেছি, ২০২৪ সালে। ’৭১ সালে এদেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতাসহ কৃষক, শ্রমিক, গৃহবধূ, নারী, পুরুষ, মাদ্রাসার ছাত্রসহ দলমত, শ্রেণিপেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।’
তিনি বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়, তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য অধিকার চায়। আজ আমাদের সময় এসেছে সকলে মিলে দেশ গড়ার।
‘এদেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, একইভাবে সমতলের মানুষ আছে। মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এদেশে বসবাস করে। আমরা চাই, সকলে মিলে এমন একটি বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন একজন মা দেখেন, অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই, যে বাংলাদেশে নারী, পুরুষ, শিশু—যেই হোক না কেন, ঘর থেকে বেরিয়ে আবার নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারবে।’
দেশের নারী, তরুণ, শিশু, প্রতিবন্ধী ও কৃষকদের কথা উল্লেখ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, এই মানুষগুলোর এই রাষ্ট্রের কাছে, এই দেশের কাছে একটি প্রত্যাশা আছে। আজ আমরা সকলে যদি ঐক্যবদ্ধ, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে আমরা এই লক্ষ-কোটি মানুষের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারি। ১৯৭১ সালে আমাদের শহীদরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এরকম একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছর স্বৈরাচারের গুম-খুনের শিকার হয়েছে শত শত মানুষ। শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, নিরীহ মানুষও প্রতিবাদ করতে গিয়ে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে, জীবন দিয়েছে। ২০২৪ সালেও আমরা দেখেছি, ছাত্রজনতা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কীভাবে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে।
এ সময় তার বক্তব্যে উঠে আসে সম্প্রতি দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হওয়া জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির কথাও। তিনি বলেন, ওসমান হাদি চেয়েছিল এদেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হোক, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক; দেশের মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক। ১৯৭১ ও ২০২৪ সালসহ বিভিন্ন সময় দেশের যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রক্তের ঋণ যদি শোধ করতে হয়, তাহলে আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আমরা সকলে মিলে কাজ করব।
আধিপত্যবাদীরা এখনও বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বলে সতর্ক করে সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান তারেক। তিনি বলেন, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের যারা আছেন, আপনারাই ভবিষ্যতে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন, দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন। গণতন্ত্র ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দেশকে গড়ে তোলার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের সদস্যদের আজ গ্রহণ করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। যেকোনো উসকানির মুখে আমাদের ধীর, শান্ত থাকতে হবে। আমরা দেশের শান্তি চাই, আমরা দেশের শান্তি চাই, আমরা দেশের শান্তি চাই।
নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘আপনারা মার্টিন লুথার কিংয়ের নাম শুনেছেন। তার একটি বিখ্যাত বক্তব্য আছে—আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম (আমার একটি স্বপ্ন আছে)। আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সকলের সামনে আমি বলতে চাই—আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান (আমার একটি পরিকল্পনা আছে), ফর দি পিপল অফ মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি।’
তিনি বলেন, এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। যদি সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয়, এই দেশের প্রতিটি মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে। আপনারা যদি আমাদের পাশে থাকেন, আমাদের সহযোগিতা করেন, তাহলে আমরা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব।
উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা আসবে, আমরা সকলে নবী করিম (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার আলোকে দেশ পরিচালনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন তিনি। মঞ্চে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, মির্জা আব্বাসসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।