বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব লক্ষণীয়—একদিকে অভিভাবকদের চরম সচেতনতা, অন্যদিকে সন্তানদের মাঝে ক্রমবর্ধমান নৈতিক অবক্ষয়। আধুনিক শিক্ষার নামে প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তুতির জন্য শিশুকে স্কুলে পাঠানো, বাসায় শিক্ষক রাখাসহ নানা উদ্যোগে অভিভাবকরা দিনরাত ব্যস্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এতসব সচেতনতার মাঝেও কেন আমাদের সন্তানরা বিপথগামী হচ্ছে? কেন নৈতিক শিক্ষা, শিষ্টাচার এবং মূল্যবোধের জায়গায় একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে?
অনেক সময় আমরা দেখি, একজন শিক্ষার্থীকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছেন মা কিংবা বাবা। টিচার্স মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছেন তারা, সন্তানকে কোচিং সেন্টারে দিচ্ছেন, আবার বাসায় আলাদা গৃহশিক্ষকের ব্যবস্থাও করছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীর নৈতিক আচরণ কিংবা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের জন্য অভিভাবকরা কতটুকু সময় দিচ্ছেন? ব্যস্ততা, আর্থিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক স্ট্যাটাস ধরে রাখার দৌড়ে পরিবার আজ হয়ে উঠেছে শুধুই ‘পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠান’, ‘মানবিক শিক্ষালয়’ নয়।
এই পরিস্থিতির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো—অর্থ-লোভ। সন্তান যদি অর্থ উপার্জনে সক্ষম হয় বা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সে কোন পথে যাচ্ছে—তা অনেক সময় অভিভাবকদের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। এমনও দেখা গেছে, সন্তান মাদকে জড়িত, অসৎ পথে সম্পদ গড়ছে—জেনেও অনেক অভিভাবক তা মেনে নিয়েছেন, কারণ তাতে পরিবারের ‘চলমানতা’ বজায় থাকছে। এই ধরনের মানসিকতা একটি ভয়ংকর ব্যাধি, যা সমাজের ভিতকে নড়বড়ে করে তুলছে।
পরিবারই হলো ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রথম ও প্রধান পাঠশালা। একজন শিশুর জীবনের নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবার থেকেই। কিন্তু যদি পরিবারে মুল্যবোধ শেখানো না হয়, শুধু একাডেমিক রেজাল্টের পেছনে ছুটতে শেখানো হয়, তাহলে সেই সন্তান বড় হয়ে হয়তো ভালো চাকরি পাবে, অর্থ উপার্জন করবে, কিন্তু শুদ্ধ মানুষ হবে না। তার কাছে মেধা থাকবে, কিন্তু মানবতা থাকবে না।
প্রশ্ন উঠতে পারে—পরিবার শিক্ষা দিচ্ছে না, নাকি শিক্ষা দিলেও তা বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে না? এক্ষেত্রে একটি বিশ্লেষণ দরকার। পরিবারে যদি শেখানো হয় ‘ভালো-মন্দ’র পার্থক্য, অথচ পরিবারের সদস্যরাই যদি সামাজিকভাবে ভুল বার্তা দেন, যেমন—ঘুষ দেওয়া, অসৎ পথে সম্পদ অর্জন, সামাজিক ভান-কপটতা—তাহলে সন্তান কী শিখবে? শিক্ষাটা তাহলে শুধু মুখে বলা, প্রয়োগে নয়।
আজকাল প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাপটে তরুণরা চাইলেই যেকোনো কিছুতে প্রবেশ করতে পারে। মাদক, পর্নোগ্রাফি, সহিংসতা, বিদ্বেষমূলক আচরণ—এসব যখন সহজলভ্য, তখন প্রয়োজন আরও বেশি পারিবারিক নজরদারি, ভালোবাসাভিত্তিক কঠোরতা এবং উদাহরণ দিয়ে শেখানো।
অভিভাবকদের সচেতনতা যেন শুধুই পরীক্ষার ফলাফল, মার্কস, নামী স্কুলে ভর্তি ও স্ট্যাটাস-নির্ভর না হয়। বরং তা হতে হবে মূল্যবোধ, সততা, সহানুভূতি এবং নৈতিকতা ভিত্তিক। কারণ, শিশুর আচরণ তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে পরিবারে পাওয়া আচরণগত শিক্ষার প্রতিফলন।
তাই অভিভাবকরা যতই সচেতন হোক, যদি তারা পরিবারে নৈতিক শিক্ষা না দেন বা সেটি নিজেদের জীবনাচরণে না দেখান, তবে যুব সমাজকে রক্ষা করা অসম্ভব। ‘লোভ’ শুধু আর্থিক নয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠার লোভ, দম্ভের লোভ—এসবই সন্তানদের সত্যিকার অর্থে শুদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে বাধা দেয়।
এই ব্যাধির নিরাময় জরুরি—আর এর শুরু হোক পরিবার থেকে। মানুষ হোক আগে মানুষ, তার পরে সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উদ্যোক্তা—সবই হতে পারবে।
-লেখক ও সাংবাদিক